ফেরাউন কত বছর বেঁচে ছিল? ইতিহাস । কুরআন ও স্কলারদে অভিমত

পোস্টটি শেয়ার করুন

ফেরাউন নামটি উচ্চারণ করলেই ইতিহাসের এক নির্মম ও অহংকারী শাসকের চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। কুরআন ও বাইবেলের বিবরণ অনুসারে, ফেরাউন ছিলেন এমন এক শাসক, যিনি নিজেকে ঈশ্বর দাবি করতেন এবং আল্লাহর রাসূল হযরত মূসা (আ.)-কে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ইসলামী ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় ফেরাউনদের বয়স ও শাসনামল নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। এই ব্লগপোস্টে আমরা মূলত ফেরাউন এর বয়স ও সে কত বছর বেঁচে ছিল, সে বিষয়ে আলোচনা করব, পাশাপাশি ইতিহাস ও আধুনিক গবেষণার ভিত্তিতে এর সত্যতা যাচাই করব।

ফেরাউন কত বছর বেঁচে ছিল? সংক্ষিপ্ত উত্তর

ফেরাউনদের বয়স ও শাসনকাল নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে হযরত মূসা (আ.)-এর সময়ে যে ফেরাউন ছিল, তার সঠিক বয়স নিয়ে নিশ্চিত কোনো দলিল নেই। তবুও ইতিহাস, কুরআন-হাদিস ও আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী কিছু তথ্য তুলে ধরা যায়।

ইতিহাসের দৃষ্টিতে

প্রাচীন মিসরের ফেরাউনদের শাসনকাল সাধারণত দীর্ঘ হতো। অনেক গবেষকের মতে, হযরত মূসা (আ.)-এর সময়কার ফেরাউন সম্ভবত রামসেস II (Ramesses II) বা মেরনেপতাহ (Merneptah) ছিলেন।

  • রামসেস II প্রায় ৯০ থেকে ৯৬ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এবং আনুমানিক ৬৬ বছর রাজত্ব করেছেন (খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৯-১২১৩)।
  • মেরনেপতাহ, যিনি রামসেস II-এর পুত্র, তিনি প্রায় ৬০-৭০ বছর বেঁচে ছিলেন এবং ১০ বছর শাসন করেছেন (খ্রিস্টপূর্ব ১২১৩-১২০৩)।
  • অন্যদিকে, কিছু গবেষক বলেন যে ফেরাউন ছিল থুতমোস III (Thutmose III), যিনি প্রায় ৫৪ বছর রাজত্ব করেছেন এবং আনুমানিক ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

তবে ইসলামী ব্যাখ্যার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ মত হলো রামসেস II-ই ছিলেন সেই ফেরাউন, যিনি হযরত মূসা (আ.)-এর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে ধ্বংস হন।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে

কুরআনে ফেরাউনের বয়স সম্পর্কে সরাসরি কিছু বলা হয়নি, তবে তার শক্তি, অহংকার এবং দীর্ঘকাল রাজত্বের ইঙ্গিত রয়েছে:

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ مَا عَلِمْتُ لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرِي

“ফেরাউন বলল: হে আমার পরিষদবর্গ! আমি আমার জন্য ছাড়া অন্য কোনো ইলাহকে জানি না।”
(সূরা আল-কাসাস: ৩৮)

এ থেকে বোঝা যায় যে, ফেরাউন দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় ছিল এবং অত্যন্ত শক্তিশালী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এছাড়া, কুরআনে ফেরাউনের মৃত্যুর বর্ণনা এভাবে এসেছে:

فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً

“আজ আমরা তোমার দেহকে রক্ষা করব, যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হও।” (সূরা ইউনুস: ৯২)

এই আয়াতের আলোকে অনেক গবেষক মনে করেন, মমি হয়ে সংরক্ষিত রামসেস II-ই সেই ফেরাউন, যার দেহ আজও গবেষণার বিষয়।

হাদিসেও ফেরাউনের বয়স সম্পর্কে সরাসরি কিছু বলা হয়নি, তবে তার অহংকার ও আল্লাহর শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

স্কলারের অভিমত

  • ড. মরিস বুকাইল (Maurice Bucaille) তার গবেষণায় বলেন, “ফেরাউনের মমি পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে তিনি পানিতে ডুবে মারা গেছেন, যা কুরআনের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়।”
  • ড. জাকির নায়েক মনে করেন, হযরত মূসা (আ.)-এর সময়কার ফেরাউন ছিলেন রামসেস II, যিনি প্রায় ৯০ বছর বেঁচে ছিলেন।
  • ইসলামিক ঐতিহাসিক আল-সুইয়ুতি ও ইবনে কাসির-এর মতে, ফেরাউন দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেছিল, তবে তার সঠিক বয়স নির্ধারণ করা কঠিন।

উপসংহার

ফেরাউনের সঠিক বয়স সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। তবে ইতিহাস ও গবেষণা অনুসারে, হযরত মূসা (আ.)-এর সময়কার ফেরাউন রামসেস II হয়ে থাকলে তিনি প্রায় ৯০-৯৬ বছর বেঁচে ছিলেন। কুরআনের আয়াত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এটিই সমর্থন করে যে, তিনি সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়েছিলেন এবং তার দেহ সংরক্ষিত রয়েছে, যা কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণ করে।

ফেরাউনের বয়স ও ইতিহাস সম্পর্কিত ৫টি প্রশ্ন ও উত্তর

১. হযরত মূসা (আ.)-এর সময়কার ফেরাউন কে ছিলেন?

উত্তর: ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী, হযরত মূসা (আ.)-এর সময়কার ফেরাউন সম্ভবত রামসেস II (Ramesses II) বা মেরনেপতাহ (Merneptah) ছিলেন। তবে ইসলামী গবেষকরা সাধারণত রামসেস II-কে বেশি সম্ভাব্য মনে করেন, কারণ তার রাজত্ব ছিল দীর্ঘ এবং তার মমিও সংরক্ষিত রয়েছে, যা কুরআনের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়।

২. ফেরাউন কত বছর বেঁচে ছিলেন?

উত্তর: সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, তবে যদি তিনি রামসেস II হন, তাহলে তিনি প্রায় ৯০-৯৬ বছর বেঁচে ছিলেন। আর যদি মেরনেপতাহ হন, তাহলে তিনি ৬০-৭০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।

৩. কুরআনে ফেরাউনের বয়স সম্পর্কে কিছু বলা হয়েছে কি?

উত্তর: না, কুরআনে ফেরাউনের নির্দিষ্ট বয়স উল্লেখ নেই। তবে কুরআনে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেছিলেন এবং অত্যন্ত ক্ষমতাধর ছিলেন। কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেরাউন সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়ে মারা যায় এবং তার দেহ সংরক্ষিত থাকে (সূরা ইউনুস: ৯২)।

৪. ফেরাউনের মমি কীভাবে সংরক্ষিত রয়েছে?

উত্তর: ঐতিহাসিকভাবে, রামসেস II-এর মমি মিশরের কায়রো মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, তার শরীরে এমন চিহ্ন রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে তিনি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে মারা গেছেন। ড. মরিস বুকাইল তার গবেষণায় এ বিষয়টি কুরআনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছেন।

৫. ইসলামী স্কলাররা ফেরাউনের বয়স সম্পর্কে কী বলেন?

উত্তর: বেশিরভাগ ইসলামী স্কলাররা ফেরাউনের সঠিক বয়স নিয়ে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য দেননি। তবে ড. জাকির নায়েক, ইবনে কাসির ও আল-সুইয়ুতি সহ অনেক গবেষক মনে করেন, ফেরাউন দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেছিলেন এবং তিনি রামসেস II হয়ে থাকলে তার বয়স ৯০ বছরের বেশি ছিল।


পোস্টটি শেয়ার করুন