মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হলো সে চায়, অন্যরা তাকে পছন্দ করুক, ভালোবাসুক ও গুরুত্ব দিক। তবে ইসলামে অন্যকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য কোনো কৌশল বা কৃত্রিম উপায় অবলম্বনের পরিবর্তে দোয়া, উত্তম চরিত্র ও ন্যায়নিষ্ঠ আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করলে এবং অন্তর থেকে তাঁর ওপর ভরসা রাখলে তিনি মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা দান করেন। এই ব্লগপোস্টে আমরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে কাউকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার দোয়া নিয়ে আলোচনা করব, যা মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়ার জন্য কার্যকর হতে পারে ইনশাআল্লাহ।
💖 আকর্ষণ বৃদ্ধির জন্য দোয়া
আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর দোয়া
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِيۙ وَيَسِّرْ لِيۡ اَمۡرِيۙ وَاحۡلُلۡ عُقۡدَةً مِّنۡ لِّسَانِيۙ يَفۡقَهُوۡا قَوۡلِيۙ
উচ্চারণ: “Rabbishrah li sadri, wa yassir li amri, wahlul ‘uqdatan min lisani, yafqahu qawli.”
অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমার বুক প্রশস্ত করে দাও, আমার কাজ সহজ করে দাও, এবং আমার জিহ্বার গ্রন্থি খুলে দাও, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” 📖 (সূরা ত্বাহা: ২৫-২৮)
🔹 এই দোয়াটি মুসা (আ.) করেছিলেন, যাতে মানুষ তাঁর কথা বুঝতে পারে ও তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করে। যদি আপনি চান, অন্যরা আপনাকে পছন্দ করুক ও আপনার প্রতি আকৃষ্ট হোক, তবে এই দোয়াটি পড়তে পারেন।
ভালোবাসা ও হৃদয়ে স্থান পাওয়ার দোয়া
اللَّهُمَّ اجْعَلْ لِي نُورًا فِي قَلْبِي، وَنُورًا فِي بَصَرِي، وَنُورًا فِي سَمْعِي، وَنُورًا فِي لِسَانِي
উচ্চারণ: “Allahummaj-‘al li nūran fī qalbi, wa nūran fī basari, wa nūran fī sam‘i, wa nūran fī lisani.”
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমার হৃদয়ে নূর দান করুন, আমার দৃষ্টিতে নূর দান করুন, আমার শ্রবণে নূর দান করুন এবং আমার ভাষায় নূর দান করুন।” 📖 (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬৩)
🔹 এই দোয়া পড়লে আল্লাহ আপনার ব্যক্তিত্বে এমন আভা দান করবেন, যা মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সাহায্য করবে।
বিশেষ দোয়া – মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করার জন্য
وَأَلْقَيْتُ عَلَيْكَ مَحَبَّةً مِّنِّي وَلِتُصْنَعَ عَلَىٰ عَيْنِي
উচ্চারণ: “Wa alqaytu ‘alayka mahabbatan minnee walitusna‘a ‘ala ‘aynee.”
অর্থ: “আমি তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা নিক্ষেপ করেছি এবং আমি নিজ চক্ষের সম্মুখে তোমাকে প্রতিপালিত করেছি।” 📖 (সূরা ত্বাহা: ৩৯)
🔹 এই আয়াত মুসা (আ.)-এর প্রসঙ্গে এসেছে, যেখানে আল্লাহ বলেন যে, তিনি তাঁর ওপর ভালোবাসা দান করেছেন। কেউ যদি আল্লাহর নিকট এই আয়াতের মাধ্যমে দোয়া করে, তবে আল্লাহ তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা বাড়িয়ে দিতে পারেন।

🛑 গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
✅ এই দোয়াগুলো পড়ার পাশাপাশি সদাচরণ, বিনয়ী আচরণ, সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
✅ কাউকে অন্যায়ভাবে মুগ্ধ করতে কালো জাদু বা হারাম পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
✅ আল্লাহর উপর ভরসা রেখে দোয়া করুন এবং ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ যদি কল্যাণ দেখেন, তবে তিনি আপনার দোয়া কবুল করবেন ইনশাআল্লাহ।
কাউকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য দোয়া করাকে কী ইসলাম সমর্থন করে?
ইসলামে কাউকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য দোয়া করা নির্ভর করে নিয়তের ওপর। যদি উদ্দেশ্য হয় ন্যায়সংগত ও হালাল সম্পর্ক গড়ে তোলা—যেমন বৈধ বিয়ে, ভালো সম্পর্ক রক্ষা, বা মানুষের ভালোবাসা অর্জন—তাহলে এ ধরনের দোয়া করা জায়েজ।
তবে যদি কারও প্রতি অন্যায়ভাবে প্রভাব বিস্তার বা হারাম সম্পর্কের উদ্দেশ্যে আকৃষ্ট করার জন্য দোয়া করা হয়, তাহলে তা ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলাম যে কোনো ধরনের প্রতারণা, যাদু বা কৌশলের মাধ্যমে অন্যের মন জয় করার প্রচেষ্টা নিষিদ্ধ করেছে।
📖 কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে, দয়াময় আল্লাহ তাদের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেবেন।” (সূরা মারইয়াম: ৯৬)
🔹 অর্থ: যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে, তাহলে তিনি নিজেই তার জন্য মানুষের অন্তরে ভালোবাসা দান করবেন।
যা করা উচিত
✅ হালাল সম্পর্কের জন্য দোয়া করা
✅ উত্তম চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করা
✅ আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা
যা করা উচিত নয়
❌ হারাম সম্পর্কের জন্য দোয়া করা
❌ যাদু বা কুফরি উপায়ে মানুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা
❌ অন্যের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থ হাসিল করা
সুতরাং, যদি দোয়া করা হয় বৈধ ও কল্যাণকর উদ্দেশ্যে, তাহলে তা অনুমোদিত। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হারাম হয়, তাহলে তা নাজায়েজ।
কাউকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার দোয়া নিয়ে ৪টি প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ইসলাম কি কাউকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য দোয়া করার অনুমতি দেয়?
✅ উত্তর: ইসলাম ন্যায়সংগত ও হালাল উদ্দেশ্যে (যেমন বৈধ বিয়ে বা ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা) দোয়া করার অনুমতি দেয়। তবে হারাম সম্পর্ক বা অন্যায়ভাবে কাউকে প্রভাবিত করার জন্য দোয়া করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
প্রশ্ন: কাউকে আকৃষ্ট করার জন্য যাদু বা তাবিজ ব্যবহার করা কি ইসলামসম্মত?
✅ উত্তর: না, ইসলাম তাবিজ, যাদু বা অন্য কোনো হারাম উপায়ের মাধ্যমে কাউকে আকৃষ্ট করা কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি যাদু করে বা করায়, সে আমাদের (মুসলমানদের) অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম: ২৯৪২)
প্রশ্ন: এমন কোনো দোয়া আছে যা মানুষের ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে?
✅ উত্তর: হ্যাঁ, কুরআনে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, দয়াময় আল্লাহ তাদের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন।” (সূরা মারইয়াম: ৯৬)
এছাড়াও, رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي… (সূরা ত্বাহা: ২৫-২৮) দোয়াটি পড়া যেতে পারে, যা মানুষের হৃদয়ে আপনার প্রতি ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশ্ন: যদি কেউ আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তবুও কাউকে আকৃষ্ট করতে না পারে, তাহলে কী করা উচিত?
✅ উত্তর: আল্লাহ যা করেন, তাতে আমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। হয়তো সেই ব্যক্তি আপনার জন্য উপযুক্ত নয় বা আল্লাহ আপনার জন্য আরও ভালো কিছু রেখেছেন। সুতরাং ধৈর্য ধরতে হবে এবং আল্লাহর পরিকল্পনার ওপর ভরসা রাখতে হবে। “হয়তো তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ কর, অথচ তাতে কল্যাণ রয়েছে।” (সূরা বাকারা: ২১৬)