মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় চাহিদা— শান্তি। দুনিয়ার দৌড়ঝাঁপ, দুশ্চিন্তা, ভয়, রোগ-বালা, মানসিক চাপ—সবকিছু পেরিয়ে মানুষ অন্তরের এমন একটি জায়গা খোঁজে যেখানে সে নিরাপদ, নির্ভার ও নিশ্চিন্ত। ইসলামে সেই স্থায়ী শান্তির উৎস একটিই — আল্লাহ, যিনি নিজেই আস-সালাম, অর্থাৎ শান্তি, নিরাপত্তা ও উত্তমতার উৎস। এই কারণেই বহু মুসলিমের মুখে আমরা একটি শব্দ শুনি— ইয়া সালাম বা ইয়া সালামু । কেউ এটি বলে বিস্ময়ে, কেউ ভয়ে, কেউ আবার প্রশান্তি খুঁজতে। কিন্তু এই শব্দটির আসল অর্থ কী?
ইয়া সালামু — শব্দটির মূল অর্থ কী?
“ইয়া সালামু” (يَا سَلَامُ) — অর্থ “হে শান্তির মালিক!”, “হে নিরাপত্তাদাতা!” বা “হে ত্রুটিমুক্ত পরম পবিত্র!” এটি আল্লাহর সুন্দর নাম আস-সালাম (ٱلسَّلَامُ) — এর দিকে আহ্বান করে বলা একটি সম্বোধন (vocative expression)।
এখানে তিনটি মূল অর্থ নিহিত:
- আল্লাহই প্রকৃত শান্তির উৎস
- আল্লাহই সকল বিপদ থেকে নিরাপত্তা দানকারী
- আল্লাহই সকল খুঁত থেকে মুক্ত, পরম পবিত্র
সুতরাং, “ইয়া সালামু” বলা মানে — আল্লাহর কাছে শান্তি, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কামনা করা।
আল্লাহর নাম ‘আস-সালাম’ থেকে ‘ইয়া সালামু’ এর উৎপত্তি
কুরআনে আল্লাহকে আস-সালাম বলা হয়েছে:
هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْمَلِكُ الْقُدُّوسُ السَّلَامُ
“তিনি আল্লাহ… রাজাধিরাজ, অতি পবিত্র, শান্তির উৎস।” (সূরা হাশর: ২৩)
“আস-সালাম” নামটি আরবি মূল শব্দ سَلِمَ / سَلام থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ:
- শান্তি
- নিরাপত্তা
- অক্ষত থাকা
- কল্যাণ
“ইয়া” (يا) একটি সম্বোধনসূচক শব্দ। তাই — يا + سلام = يا سلام → “হে সালাম”, অর্থাৎ “হে নিরাপত্তাদাতা আল্লাহ।” এভাবেই “ইয়া সালামু” ব্যবহার শুরু হয় — আল্লাহর নাম স্মরণ ও জিকিরের মাধ্যমে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ইয়া সালামু’
✔️ জায়েয (অনুমোদিত)
আল্লাহর ৯৯টি সুন্দর নামের যেকোনোটি সম্বোধন করে বলা জায়েয— যেমন: “ইয়া রহমান”, “ইয়া গফুর”, “ইয়া সালাম”— সবই বৈধ।
কারণ: এটি দোয়া ও জিকিরেরই একটি ধরন। তবে লক্ষণীয়—
“ইয়া সালাম” বা “ইয়া সালামু” বলা কোন নির্দিষ্ট সুন্নতি দোয়া নয়, বরং সাধারণ সম্বোধনমূলক জিকির।
✔️ কখন বলা হয়?
– ভয় বা দুশ্চিন্তার সময়
– মানসিক অস্থিরতায়
– বিপদ থেকে রক্ষা কামনায়
– শান্তি ও সুরক্ষা চাইলে
– জিকির বা নাশিদে
✔️ সতর্কতা
এটি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা, সময় বা রীতি বেঁধে নেওয়া উচিত নয়। কারণ নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করলে বিদআতের শঙ্কা থাকে।
কুরআন ও হাদীসে ‘সালাম’ ধারণা
১. কুরআনে সালাম — শান্তি ও নিরাপত্তার ঘোষণা
- জান্নাতে আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে সালাম পাঠাবেন: “তাদেরকে সালাম বলে অভিবাদন জানানো হবে।” (সূরা ওয়াকিয়া: ২৬)
- জান্নাতের অভিবাদন: “তাদের অভিবাদন সেদিন হবে — সালাম।” (সূরা আহযাব: ৪৪)
- আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি সালাম: “শান্তি অর্পিত হোক আমার বান্দাদের ওপর।” (সূরা নামাল : ৫৯)
২. হাদীসে সালাম — দোয়া ও কল্যাণের বার্তা
রাসুল ﷺ বলেন: “তোমরা নিজেদের মধ্যে সালাম প্রচার করো।” (সহিহ মুসলিম)
সালামের অর্থ:
- নিরাপত্তা
- শান্তি
- কল্যাণ
- দোয়া
সুতরাং ‘ইয়া সালামু’ হলো —
আল্লাহর সেই নামকে ডাক দিয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার কামনা করা— যা কুরআন-হাদীসের ‘সালাম’ ধারণারই একটি ব্যক্তিগত প্রয়োগ।
আল্লাহকে ‘ইয়া সালাম’ বলে ডাকলে কী বোঝায়?
“ইয়া সালাম” বলা মানে হলো— শান্তির উৎস আল্লাহকে সরাসরি আহ্বান করা, তাঁর থেকে নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও হৃদয়ের প্রশান্তি চাওয়া।
কারণ “আস-সালাম” আল্লাহর একটি নাম, যার মধ্যে তিনটি অর্থ নিহিত:
- যিনি নিরাপত্তা দান করেন,
- যিনি সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত,
- যিনি সকল শান্তির মালিক।
সুতরাং “ইয়া সালাম” বলা একটি দোয়া— এতে বান্দা আল্লাহর কাছে জানায়:
- আমার ভয় দূর করুন,
- আমার হৃদয় শান্ত করুন,
- আমাকে বিপদ থেকে নিরাপদ রাখুন।
এটি কোনো আলাদা রীতি নয়; বরং এক ধরনের সম্বোধনমূলক জিকির যা আল্লাহর নৈকট্য অনুভব করায়।
জিকিরে ‘ইয়া সালাম’ ব্যবহারের নিয়ম ও ভুল ধারণা
✔️ যেভাবে বলা সুন্নত-সম্মত:
- সীমাহীনভাবে বলা জায়েয
- নামাজের বাইরে দোয়া ও জিকির হিসেবে
- দুশ্চিন্তা, ভয় বা কষ্টের মুহূর্তে
- আল্লাহর মহান নামগুলোর সাথে জিকিরে (যেমন: “ইয়া হাফিজ, ইয়া সালাম”)
❌ কিন্তু যেসব ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি:
- নির্দিষ্ট সংখ্যা বেঁধে দেওয়া: যেমন— “ইয়া সালাম ৫০০ বার পড়লে রোগ সেরে যাবে”—
এ ধরনের কথা শরীয়ত-সমর্থিত নয়। - ‘ইয়া সালাম’ কে চিহ্নিত করে ভুয়া তাবিজ বানানো: এসব কার্যকলাপ বিদআত ও কুসংস্কারের মধ্যে পড়ে।
- ‘ইয়া সালাম’ কে বাধ্যতামূলক করা: এটি অবশ্যকর্তব্য নয়; সাধারণ দোয়া হিসেবেই ব্যবহারযোগ্য।
- অন্যান্য ভাষায় অর্থ না বুঝে যান্ত্রিকভাবে জিকির করা: আল্লাহকে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য হৃদয় থেকে হতে হবে।
🔎 মূলনীতি: “ইয়া সালাম” বলা জায়েয, কিন্তু শরীয়ত যেখানে কিছু নির্দিষ্ট করেনি, সেখানে জটিল রীতি বানানো নিষেধ।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ: ‘ইয়া সালামু’ হৃদয়ের প্রশান্তির ডাক
জীবনের প্রতিদিনের ক্লান্তি, উদ্বেগ ও অস্থিরতার মাঝে মানুষ শান্তি খুঁজে ফেরে।
“ইয়া সালামু” সেই অভ্যন্তরীণ শান্তিরই একটি আধ্যাত্মিক ডাক।
এর প্রভাব তিনভাবে দেখা যায়—
১. হৃদয়ের ভয়ের অবসান
বান্দা যখন “হে সালাম” বলে ডাকে, তখন সে আল্লাহর কাছে আশ্বাস চায়— “হে রব, আমাকে নিরাপদ করো।”
২. মন থেকে নেতিবাচকতা দূর হয়
আল্লাহর প্রতিটি নামের নিজস্ব প্রভাব আছে। “আস-সালাম” নামটি শান্তি দানকারী, তাই জিকিরটি প্রশান্তি আনে।
৩. আত্মা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে
জিকিরের মাধ্যমে হৃদয় নরম হয়, কঠোরতা কমে, আন্তরিকতা বাড়ে।
অনেকে বলেন— “ইয়া সালামু পড়লে মনে অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে।” এটি মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক— উভয়দিক থেকেই সত্য।
দৈনন্দিন জীবনে ‘ইয়া সালামু’ ব্যবহারের উদাহরণ
✔️ ১. ভয় পেলে বা হঠাৎ কোনো বিপদে পড়লে
যেমন গাড়ি দুর্ঘটনার কাছাকাছি মুহূর্তে— “ইয়া সালামু!” এটি প্রাকৃতিক দোয়া হয়ে যায়।
✔️ ২. দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলে
মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শান্তির জন্য আল্লাহকে ডাকে।
✔️ ৩. সন্তান ভয়ে কাঁদলে
মা-বাবা দোয়া করে— “ইয়া সালাম, আমার শিশুকে নিরাপদ রাখো।”
✔️ ৪. মানসিক চাপের মুহূর্তে
কাজের স্ট্রেস, পরীক্ষার টেনশন বা দুশ্চিন্তায়— মন শান্ত করতে “ইয়া সালামু” বলা যায়।
✔️ ৫. কারো জন্য দোয়া করতে
– “আল্লাহ তোমার ওপর সালাম বর্ষণ করুন।”
– “ইয়া সালাম, তাকে নিরাপত্তা দাও।”
✔️ ৬. জিকির ও তিলাওয়াতের মাঝে
যেমন— “ইয়া সালাম, ইয়া রহমান, ইয়া রাহিম।”
✔️ ৭. ঘুমের আগে শান্তির জন্য
অনেকে ঘুমানোর আগে জিকির হিসেবে আল্লাহর নামসমূহ পাঠ করেন— এর মধ্যে “ইয়া সালাম”ও বলা হয়।
স্বাস্থ্য ও মানসিক শান্তির সাথে ‘ইয়া সালাম’ জিকিরের সম্পর্ক
“ইয়া সালাম” এমন একটি জিকির, যা আল্লাহর শান্তিদাতা নামের মাধ্যমে হৃদয়কে প্রশান্ত করে।
আধুনিক গবেষণা ও ইসলামী আধ্যাত্মিকতা—দুটি ক্ষেত্রেই জিকিরের বিশাল প্রভাব প্রমাণিত।
যা হয়:
- উদ্বেগ, ভয় ও টেনশন কমে
- হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হয়
- মনোযোগ বাড়ে
- নেতিবাচক চিন্তা হ্রাস পায়
- ঘুম দ্রুত আসে
যখন মানুষ “ইয়া সালাম” বলে, তখন সে মূলত আল্লাহর কাছে শান্তি চাইছে— আর এই অনুরোধ নিজেই মানুষের ভেতরে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে।
সুফি সাহিত্য ও নাশিদে ‘ইয়া সালাম’ এর ব্যবহার
সুফি সাহিত্য, কবিতা, নাশিদ ও কাওয়ালিতে “ইয়া সালাম” খুবই জনপ্রিয় একটি সম্বোধন।
এর কয়েকটি ব্যবহার হলো:
- আল্লাহকে প্রেমময়ভাবে ডাকা
- মানসিক অস্থিরতায় শান্তির প্রার্থনা
- আল্লাহর নিরাপত্তা চাওয়ার কবিতাময় রূপ
- নাশিদে সুরের সাথে হৃদয়ের প্রশান্তি প্রকাশ
সুফিরা “ইয়া সালাম” শব্দটি দিয়ে বুঝাতে চান— আল্লাহই শান্তির উৎস, তিনিই দুঃখের অবসানকারী।
‘ইয়া সালাম’ ও ‘সালামুন আলাইকুম’ — পার্থক্য কোথায়?
| বিষয় | ইয়া সালাম | সালামুন আলাইকুম |
|---|---|---|
| অর্থ | হে শান্তিদাতা আল্লাহ! | তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক |
| ব্যবহার | দোয়া ও জিকির | মুসলিমদের পরস্পরের অভিবাদন |
| উদ্দেশ্য | আল্লাহকে আহ্বান | অপরকে শান্তি প্রদান |
| উৎস | আল্লাহর নাম “আস-সালাম” | সুন্নাহর সালাম পদ্ধতি |
| বলার সময় | ভয়, কষ্ট, জিকিরে | দেখা হলে, কথা শুরুতে |
‘ইয়া সালাম’ জিকির করার উপকারিতা
১. আল্লাহর নাম স্মরণে সওয়াব: আল্লাহর ৯৯ নামের যেকোনোটি স্মরণ করলেই সওয়াব হয়—
“ইয়া সালাম” তারই একটি রূপ।
২. ভয় ও দুশ্চিন্তা দূর হয়: আল্লাহ শান্তি দানকারী, তাই এই নাম হৃদয়কে শান্ত করে।
৩. বিপদ থেকে নিরাপত্তা চাওয়া: এই জিকির এক প্রকার দোয়া— “হে সালাম, তুমি নিরাপত্তা দাও।”
৪. আত্মার প্রশান্তি বৃদ্ধি: “আস-সালাম” নামটি আত্মাকে স্থিরতা দেয়, বিশেষত দুশ্চিন্তার সময়।
৫. আল্লাহর নৈকট্য বৃদ্ধি : তাঁর নাম ডাকলে আল্লাহ বান্দার দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন।
‘ইয়া সালাম’ সংক্রান্ত প্রচলিত ভুল ও বিডআত বিষয়ক আলোচনা
❌ ১. নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা
যেমন— “ইয়া সালাম ১০০০ বার পড়ো, সব সমস্যা সমাধান”— এ ধরনের কথা শরীয়তে নেই।
❌ ২. তাবিজে লিখে ঝুলানো
এটি কুসংস্কার; রাসুল ﷺ কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
❌ ৩. নির্দিষ্ট দিন বা রাতে বাধ্যতামূলক করা
এসব নির্দিষ্টকরণ বিদআতের মধ্যে পড়ে।
❌ ৪. ইউটিউব/অডিও চালিয়ে রেখে ‘ফজিলত’ আশা করা
জিকির হৃদয় থেকে না হলে উপকার পাওয়া যায় না।
✔️ সঠিক পদ্ধতি:
- ইচ্ছামতো, সীমাহীনভাবে বলা
- দোয়ার মনোভাব নিয়ে বলা
- সুন্নাহ বিরোধী রীতি তৈরি না করা
আল্লাহর ৯৯ নামের মধ্যে ‘আস-সালাম’ — কেন বিশেষ?
১. আল্লাহর পরম পবিত্রতা ঘোষণা
আস-সালাম’ অর্থ—
“ত্রুটিমুক্ত, শান্তির উৎস।”
২. নিরাপত্তা দানকারী
সমস্ত নিরাপত্তা, শান্তি, সুরক্ষা—
এ নামের মধ্যেই নিহিত।
৩. জান্নাতে আল্লাহর সালাম
কুরআনে এসেছে— আল্লাহ নিজেই জান্নাতবাসীকে সালাম দেবেন। এটি এই নামের মাহাত্ম্য নির্দেশ করে।
৪. দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তির দোয়া
মানুষ আল্লাহকে এই নামে ডাকলে। মনে আশা জন্মায়— তিনিই শান্তি দিবেন।
‘ইয়া সালাম’ কি দোয়া নাকি জিকির?
উত্তর: দুটোই।
✔️ দোয়া হিসেবে
“হে সালাম, শান্তি দাও”— এটি সরাসরি আল্লাহর কাছে আবেদন।
✔️ জিকির হিসেবে
আল্লাহর একটি নাম স্মরণ করা— যা সওয়াবের কাজ।
✔️ কখন বলা যায়?
- ভয় পেলে
- দুশ্চিন্তায়
- বিপদের মুহূর্তে
- জিকিরের মাঝে
- ঘুমানোর আগে
✔️ কীভাবে বলা sunnah-সম্মত?
- কোনো নির্দিষ্ট রীতি ছাড়া
- শুধুই আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য
- হৃদয়ের উপস্থিতি রেখে
প্রয়োজনের সময় ‘ইয়া সালাম’ বলার সুন্নতি বিকল্প কী?
“ইয়া সালাম” বলা নিষিদ্ধ নয়—বরং আল্লাহর নাম স্মরণ করা একটি ভালো কাজ। তবে বিপদ, ভয়, কষ্ট বা আতঙ্কের মুহূর্তে রাসুল ﷺ যেসব দোয়া শিখিয়েছেন, সেগুলো বেশি সুন্নতি।
সুন্নতি বিকল্পগুলো হলো:
حَسْبُنَا اللّٰهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল — ভয়, বিপদ, দুশ্চিন্তায় সর্বোত্তম।
لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
ইউনুস আ. এর দোয়া। সংকট, বিপদে মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া।
اللّٰهُمَّ أَنْتَ السَّلَامُ وَمِنْكَ السَّلَامُ
এতে “সালাম” নামটি সরাসরি এসেছে।
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ”
ভয় ও অসহায়ত্বে রাসুল ﷺ-এর নিয়মিত দোয়া।
أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمِّ وَالْحُزْنِ
দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতার সময়।
তাই: “ইয়া সালাম” বলা যায়, কিন্তু সুন্নাহ অনুযায়ী উপরোক্ত দোয়াগুলোই মূলত বেশি উপযোগী ও প্রমাণিত।
শিশুদের জন্য ‘ইয়া সালাম’ শেখানোর উপায়
শিশুকে আল্লাহর নামের সাথে পরিচয় করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “ইয়া সালাম” শেখানো তাদের মনে শান্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
১. গল্পের মাধ্যমে শেখানো
- “আল্লাহ আমাদের শান্তি দেন—তাই আমরা বলি ‘ইয়া সালাম’।”
- ছোট ছোট গল্প ব্যবহার করা যেতে পারে।
২. ছবি ও কার্টুনের সাহায্যে
শান্তি, ফুল, কবুতর—এমন চিত্র ব্যবহার করে অর্থ বোঝানো সহজ হয়।
৩. দোয়া শেখানোর সময় যুক্ত করা
“আল্লাহুম্মা আনতা সালাম…” দোয়ার সাথে “ইয়া সালাম” পরিচয় করিয়ে দিলে দ্রুত মনে থাকে।
৪. ভয় পেলে বা দুঃখ পেলে বলতে উদ্বুদ্ধ করা
যেমন: “বাবা, ভয় পেয়েছ? চল একসাথে বলি—ইয়া সালাম।”
৫. গান ও নাশিদের মাধ্যমে
শিশুরা গানের মাধ্যমে সহজে মুখস্থ করতে পারে।
‘ইয়া সালাম’ নিয়ে জনপ্রিয় ইসলামী গানে ব্যবহৃত লাইনগুলো
বিভিন্ন নাশিদ, তুর্কি-আরবি সুফি গান ও কাওয়ালিতে “ইয়া সালাম” ব্যবহৃত হয়েছে।
কিছু জনপ্রিয় লাইন:
“يا سلام… يا سلام… يا رب سلّم سلّم”
আরবি সুফি নাশিদ
“يا سلام عليك يا رب، أنزل على قلبي السلام”
হারমোনিয়ামভিত্তিক তুর্কি সুফি গান
“Ya Salam Ya Allah… Fill my heart with peace”
ইংলিশ-আরবি নাশিদ ভার্সন
يا سلامُ على من يلجأ إليك، فتمنحه الطمأنينة
আধুনিক আরবি নাশিদ
এগুলোতে মূলত শান্তি, নিরাপত্তা, দুঃখ দূরীকরণ ও আল্লাহর দয়া চাওয়ার আবেদন দেখা যায়।
ভুল অনুবাদ ও সঠিক অর্থ — পাঠকের সাধারণ প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: ‘ইয়া সালাম’ কি “হে শান্তি” অর্থে ব্যবহৃত হয়?
সঠিক অর্থ: “হে শান্তিদাতা আল্লাহ!”
✔️ এটি আল্লাহর নাম “আস-সালাম” এর সম্বোধন।
❌ কোনো বিমূর্ত “শান্তি” নয়।
প্রশ্ন ২: এটি কি নির্দিষ্ট ফজিলতসহ জিকির?
না। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা ফজিলত সহকারে বর্ণিত নয়।
প্রশ্ন ৩: “ইয়া সালাম” পড়লে কি রোগ ভালো হয়?
রোগ সারানোর কোনো সরাসরি প্রমাণ নেই।
তবে জিকিরে হৃদয়ের প্রশান্তি পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৪: এটি কি দোয়া নাকি জিকির?
উভয়ই। সম্বোধন হওয়ায় এটি দোয়ার মতো, আর আল্লাহর নাম হওয়ায় এটি জিকিরও।
প্রশ্ন ৫: বিডআত কোথায় হয়?
- নির্দিষ্ট সংখ্যা বাধ্যতামূলক করলে
- বিশেষ রাতে নির্দিষ্ট রীতি বানালে
- তাবিজ-তুমার বানালে
উপসংহার — শব্দটি ব্যবহারে ভারসাম্য ও সঠিক দিকনির্দেশনা
“ইয়া সালাম” একটি সুন্দর জিকির— আল্লাহর নাম স্মরণে শান্তি আসে, মন প্রশান্ত হয়, ভয় কমে। তবে এটিকে এমনভাবে ব্যবহার করা ঠিক নয় যেন এটি ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট ফজিলত বা পূর্ণাঙ্গ দোয়া হিসেবে প্রমাণিত।
✔️ বলা যায়
✔️ জিকির হিসেবে উপকারী
✔️ দোয়ার মতো প্রয়োগযোগ্য
কিন্তু—
❌ নির্দিষ্ট সংখ্যা চাপিয়ে দেওয়া
❌ কুসংস্কার তৈরি
❌ অপ্রমাণিত ফজিলত প্রচার —এগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি।
শুদ্ধ পদ্ধতি হলো: আল্লাহর উপর ভরসা রেখে, হৃদয়ে উপস্থিতি রেখে— শান্তির আশায় ‘ইয়া সালাম’ বলা।