৪০ দিন তাহাজ্জুদ | উপকার | পুরস্কার এবং আল্লাহ সন্তুষ্টি

তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। এ নামাজে মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এটা আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার অন্যতম উপায়। ৪০ দিন তাহাজ্জুদ নামায পড়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে বলে লোকমুখে প্রচলন রয়েছে।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদ আদায় করতেন এবং মুমিনদের উৎসাহ দিয়েছেন তাহাজ্জুদ আদায় করতে। একজন মুমিন জীবনের সফলতা হচ্ছে শয়তানকে চ্যালেঞ্জ করে, আরামকে বিসর্জন দিয়ে, রাতের কিছুটা অংশ তাহাজ্জুদে কাটানো। টানা ৪০ দিন তাহাজ্জুদ আদায় ও তার বিশেষ কোনো উপকারের পক্ষে গ্রহণ্যযোগ্য কোনো হাদিস রয়েছে কি না সেটা আমরা এই পোস্টে আলোচনা করছি।

৪০ দিন তাহাজ্জুদ । শিকড়ের সন্ধান

৪০ দিন তাহাজ্জুদ নামায পড়ার বিশেষ কোনো ফজিলত সংক্রান্ত হাদিস আমরা পাইনি। ইসলামে ৪০ সংখ্যাটির একটি বিশেষ মূল্য রয়েছে। কুরআন ও হাদিসে বিভিন্ন ঘটনা ও আমলের সাথে ৪০ দিনের যোগসূত্র রয়েছে। এখান থেকে অনেকে মানুষ টানা ৪০ দিন তাহাজ্জুদ আদায়ের ফজিলত সংক্রান্ত ভুল ও বানোয়াট গল্প বলে বেড়ায়। প্রকৃত পক্ষে ৪০ তাহাজ্জুদ পড়াকে উল্লেখ করে হাদিসে কোনো উপকারীতা ও ফজিলতের কথা উল্লেখ নেই।

তবে আপনি যদি স্বাভাবিকভাবে ৪০ দিন তাহাজ্জুদ আদায় করেন তাহলে সেটা করতে অসুবিধা নেই। আপনি তাহাজ্জুদের যে সকল ফজিলত রয়েছে সেটা পাবেন। আপনার প্রয়োজন আপনি আল্লাহর কাছে বলবেন এর জন্য তাহাজ্জুদ হচ্ছে সেরা উপায়। চাকরির প্রয়োজনে, টাকার প্রয়োজনে বা বিপদে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ুন।

তাই আমাদের যা কিছু দরকার, আল্লাহর কাছে চাওয়া উচিত। কারো কাছ থেকে কিছু পেতে হলে তার সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হওয়া প্রয়োজন; একইভাবে, আল্লাহর কাছ থেকে কিছু পাওয়ার জন্য, আমার দয়াময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে একটি ভাল সম্পর্ক স্থাপন করা অপরিহার্য। আর বান্দা আল্লাহর সাথে সর্বোত্তম সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে একমাত্র তাহাজ্জুদের মাধ্যমে। সেই আল্লাহ তায়াল দুনিয়ার নিকটতম আকাশে নেমে এসে ডাকতে থাকেন, কার কি দরকার। আমাকে বল। আমি তার ডাকে সাড়া দেব।

ইসলামে ৪০ দিনের অবস্থান

ইসলামের সাথে ৪০ দিনের বেশ শক্ত যোগসূত্র রয়েছে। ৪০ সংখ্যাটি পবিত্র কুরআনে চারটি স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে: এর মধ্যে তিনটি মূসা আলাইহিস সালামের গল্পে আর চতুর্থটি, মানুষ তার পৌড়ত্বে পৌছার বয়স সংক্রান্ত আলোচনায়।

এই সংখ্যাটি সুন্নাতেও বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে ওহী আসে চল্লিশের পরে। ভ্রূণের সৃষ্টি, এবং তার শরীর গঠন ইত্যাদি আলোচনায় ৪০ সংখ্যাটি রয়েছে। ৪০ দিন জামাতে নামাজের ফজিলত সংক্রান্ত হাদিস যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

من صلى لله أربعين يومًا في جماعة، يدرك التكبيرة الأولى، كتبت له براءتان؛ براءة من النار، وبراءة من النفاق 

অনুবাদ: যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য ৪০ দিন তাকবিরে উলা ( প্রথম তাকবিরসহ) নামাজ আদায় করবে, তার জন্য দুটি মুক্ত লিখা হবে- জাহান্নাম থেকে মুক্তি। নিফাক থেকে ‍মুক্তি। ( তিরিমিযি)

৪০ দিন তাহাজ্জুদ নামায পড়ার উপকারিতা

আমরা ইতিপূর্বে বলে এসেছি ৪০ দিন তাহাজ্জুদ আদায়ের বিশেষ কোনো ফজিলত নেই। তদুপরি আপনি যদি এই নামাজ ৪০ দিন আদায় করে তাহলে তাহাজ্জুদের সাধারণ যে সকল উপকার রয়েছে তা লাভ করতে পারেন। যেমন

  • আল্লাহর নৈকট্য লাভ।
  • আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল হওয়ার সম্ভাবনা।
  • আপনার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • আপনার পাপের ক্ষমা লাভ।
  • জান্নাতের পথ সুগম হওয়া।
  • আপনার আমলের ওজন পুণ্য বৃদ্ধি পাওয়া।
  • আপনার আত্মাতিক উন্নতি।
  • আপনার ঈমান বৃদ্ধি।
  • নিজেকে একজন প্রকৃত মুসলমান হিসেবে গড়ে তুলা।

তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত সংক্রান্ত হাদিস

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘ প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ আল্লাহ নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন। তখন বলতে থাকেন – কে আছো, আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে? আমি তার চাওয়া পূর্ণ করে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব? (বুখারী ও মুসলিম)

মিশকাতুল মাসাবিহ গ্রন্থের লেখক আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তিন শ্রেনির ব্যক্তির প্রতি সন্তুষ্ট হন।

  • এক. যে রাতে তাহাজ্জুদের জন্য জেগে ।
  • দুই. লোকেরা যখন সালাতের জন্য কাতার বাঁধে।
  • তিন. আল্লাহর পথে লড়াই করার জন্য সারিবদ্ধ মুজাহিদরা। (হাদিস নম্বর ১১৬০/২)

উপরোক্ত হাদিস বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, তাহাজ্জুদ সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নামাজ। প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উচিত এই নামাজ আদায় করা। এ নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সহজ হবে। সুতরাং কোন ব্যক্তি ৪০ দিন তাহাজ্জুদ আদায় করলে আশা করা যায় যে আল্লাহ প্রিয় বান্দাদের কাতারে শামিল হতে পারবে।

৪০ দিন তাহাজ্জুদ ও একটি সতর্কবাণী

আমি বিভিন্ন ওয়েবসাইটে দেখেছি যে, লোকেরা ৪০ দিন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়লে নির্দিষ্ট উপকার হবে বলে নানান কথা বলেছে। কিন্তু তাদের কথা মিথ্যা। কারণ কুরআন ও হাদিস কোথাও বলা হয়নি যে, ৪০ দিন তাহাজ্জুদ নামায আদায় করলে সে সব উপকার লাভ করা যাবে।

তাই ৪০ দিন তাহাজ্জুদ নামায পড়লে যে কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব এই ধারণা আমাদের পরিহার করা উচিত। তবে আমাদের বিশ্বাস করতে পারি যে, রা ৪০ দিন তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে সামগ্রিক উপকার লাভ করা যাবে।

কিছু সাধারণ প্রশ্ন উত্তর

আমি তাহাজ্জুদ দ্বারা উপকৃত হলাম কি না জানব কিভাবে?

তাহাজ্জুদ আদায়ের দ্বারা আপনি উপকৃত হচ্ছেন কিনা নির্দিষ্ট ও পঙ্খানুপঙ্খুভাবে জানার কোনো উপায় নেই। তবে কিছু বিষয় রয়েছে যা আপনার তাহাজ্জুদের ফল হিসাবে ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে।

প্রথমত, তাহাজ্জুদে আপনার করা দুআ কবুল করার তিনটি উপায় রয়েছে।

  • আপনি দুআতে যা চাইবেন আল্লাহ আপনাকে ঠিক সেটাই দেবেন।
  • হয়ত আল্লাহ তায়ালা আপনার দোয়ায় আপনি যা চেয়েছেন তা দেবেন না বরং এর বদলে আপনার থেকে কোনো বিপদ বা রোগ দূর করবেন।
  • তুমি যা চাইবে আল্লাহ তা দিবেন না। পরিবর্তে, তিনি জান্নাতে আপনার জন্য উত্তম নিয়ামত প্রস্তুত করে রাখবেন।

মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তার বান্দার জন্য উপযুক্ত জিসিসটাই দান করেন। হতে পারে আপনি যা চেয়েছেন তা আপনার জন্য উপযুক্ত নয়। কিন্তু আপনি তা জানো না, আল্লাহ তা জানেন। এ কারণেই আল্লাহ আপনাকে আপনার যা প্রয়োজন তা দেননি বরং সংরক্ষণ করেছেন যাতে আপনি পরকালে এটি থেকে উপকৃত হতে পারেন।

দ্বিতীয়তঃ আপনি পরকালে তাহাজ্জুদের সওয়াব উপভোগ করবেন। পৃথিবীতে, আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনার আত্মা ধীরে ধীরে পরিশুদ্ধ হচ্ছে এবং আপনার ঈমার মজবুত হচ্ছে।

আমি কিভাবে নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করব?

প্রতি রাতে একটু আগে ঘুম থেকে উঠতে শুরু করুন। এশার নামাজের পর অযথা সময় নষ্ট বা গল্প না করে ঘুমিয়ে যান। মোবাইলে এলরাম সেট করে রাখুন। এভাবে ধীরে ধীরে তাহাজ্জুদের রুটিনে অভ্যস্ত হতে পারবেন।

আমি কি ৪০ দিনের মধ্যে কোনো রাত মিস করতে পারি?

হ্যাঁ, আপনি ৪০ দিনের মধ্যে যে কোনো রাত মিস করতে পারেন। কারণ টানা ৪০ রাত ধরে তাহাজ্জুদ পড়া সুন্নাহ বা শরিয়া নির্দেশিত নয়। তবে আপনি যদি একটি রাত মিস করলে বাকি অন্য রাতে অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া উত্তম।

মহিলারা কি ৪০ রাত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে পারে?

হ্যাঁ, মহিলারা ৪০ রাত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে পারেন। তারা বাড়িতে এটি সম্পাদন করবে। কিন্তু তা করতে গিয়ে স্বামীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

আমি কি তাহাজ্জুদের ৪০ দিনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দুআ করতে পারি?

হ্যাঁ, ৪০ দিন তাহাজ্জুদের সময় ব্যক্তিগত দুআ করতে পারেন। দুআর সর্বোত্তম সময় হল তাহাজ্জুদ। কারণ রাতের এই বিশেষ সময়ে আল্লাহ বেশি দোয়া কবুল করেন।

Leave a Comment